Article | Blog

আমাদের একজন জীবন্ত কিংবদন্তি বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম

শাহ আবদুল করিম | বাউল সাধক সংগীত শিল্পী 

জন্মঃ ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৬ সুনামগঞ্জ, বাংলাদেশ 
মৃত্যুঃ ১২ সেপ্টেম্বর, ২০০৯ 
Shah Abdul Karim
ছবিঃ শাহ আবদুল করিম 
''হিন্দু-মুসলমান এটা বড় নয়, আমরা বাঙালি, আমরা মানুষ'' - শাহ আবদুল করিম। 

বাংলা বাউল গানের কিংবদন্তি হিসেবে পরিচিত শাহ আবদুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। অভাব অনটনের মাঝেও দিনে মাঠে রাখাল বালকদের মত কাজ করে রাতে নৈশ-বিদ্যালয়ে যেতেন পড়াশোনা শিখতে যার কারনে উনি ছিলেন অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন স্বশিক্ষিত একজন মানুষ। দরিদ্র কৃষক পরিবারে বেড়ে উঠলেও দারিদ্র্য ও জীবন সংগ্রামের মাঝে বড় হওয়া বাউল শাহ আবদুল করিমের সঙ্গীত সাধনার শুরু ছেলেবেলা থেকেই। তখন থেকেই একতারা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। জীবন কেটেছে সাদাসিধেভাবে। তিনি খুব ছোটবেলায় তার গুরু বাউল শাহ ইব্রাহিম মাস্তান বকশ এবং কমর উদ্দিন, সাধক রসিদ উদ্দিন সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা নেন, সেইসাথে বাউল ও আধ্যাত্মিক গানের তালিম। তিনি শরীয়তী, মারফতি, নবুয়ত, বেলায়া সহ সবধরনের বাউল গান এবং গানের অন্যান্য শাখার চর্চাও করেছেন।
শাহ আবদুল করিম 'আফতাব-উন-নেসা'কে বিয়ে করেন, যাকে তিনি 'সরলা' নামে ডাকতেন। সরলাকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সরলা না থাকলে আমি বাউল শাহ আব্দুল করিম হতে পারতাম না। সরলা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। আমার বাউল জীবনের মুর্শিদজ্ঞান সরলা।’ তিনি ১৯৫৭ সাল থেকে তার জন্মগ্রামের পাশে উজানধল গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। এ সময় তিনি গুরুদের সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে হাওড় অঞ্চলে গান গেয়ে বেড়াতেন। 

শাহ আব্দুল করিম বাংলার লোকজ সংগীতের ধারাকে আত্মস্থ করেছেন অনায়াসে। নারী-পুরুষের মনের কথা ছোট-ছোট বাক্যে প্রকাশ করেছেন আকর্ষণীয় সুরে। ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তার গান কথা বলে সব অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তিনি তার গানের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন প্রখ্যাত বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ, পুঞ্জু শাহ এবং দুদ্দু শাহর দর্শন থেকে। অসংখ্য গণজাগরণের গানের রচয়িতা বাউল শাহ আব্দুল করিম অত্যন্ত সহজ সরল জীবন যাপন করতেন। গানে-গানে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি লড়াই করেছেন ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে। এজন্য মৌলবাদীদের দ্বারা নানা লাঞ্ছনারও শিকার হয়েছিলেন তিনি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, কাগমারী সম্মেলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে মানুষকে প্রেরণা যোগায় শাহ আব্দুল করিমের গান। গানের জন্য মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহচর্যও পেয়েছেন তিনি।

স্বল্প শিক্ষিত বাউল শাহ আব্দুল করিম গান লিখেছেন ও সুর দিয়েছেন ১৬০০ এরও বেশি গানে। সাতটি বইয়ে গ্রন্থিত আছে এসব গান। বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে তাঁর ১০টি গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে।  শিল্পীর চাওয়া অনুযায়ী সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের উদ্যোগে বাউল আব্দুল করিমের সমগ্র সৃষ্টিকর্ম নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বাউল শাহ আবদুল করিমের এ পর্যন্ত ৭টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো হলো- আফতাব সংগীত, গণ সংগীত, কালনীর ঢেউ, ভাটির চিঠি, কালনীর কূলে, দোলমেলা এবং শাহ আব্দুল করিম রচনাসমগ্র। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে তাঁর রচনাসমগ্র (অমনিবাস)-এর মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। এছাড়াও সুমনকুমার দাশ সম্পাদিত শাহ আবদুল করিম স্মারকগ্রন্থ (অন্বেষা প্রকাশন) তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালে প্রথমা থেকে প্রকাশিত হয় সুমনকুমার দশের ‘শাহ আবদুল করিম: জীবন ও গান’ বইটি। বইটি একটি প্রামাণ্য জীবনী হিসেবে বোদ্ধামহলে স্বীকৃতি পেয়েছে।
বাউল শাহ আব্দুল করিম বাউল গানে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। বাউল গানের জগতে তাঁকে ‘বাউল সম্রাট’ হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়।  বাউল সাধক শাহ আবদুল জীবনের একটি বড় অংশ লড়াই করেছেন দারিদ্র্যের সাথে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময় তার সাহায্যার্থে এগিয়ে এলেও তা যথেষ্ট ছিল না।উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে সাউন্ড মেশিন নামের একটি অডিও প্রকাশনা সংস্থা তার সম্মানে ‘জীবন্ত কিংবদন্তীঃ বাউল শাহ আবদুল করিম’ নামে বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া তার জনপ্রিয় ১২ টি গানের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। এই অ্যালবামের বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ তাঁর বার্ধক্যজনিত রোগের চিকি‍ৎসার জন্য তার পরিবারের কাছে তুলে দেয়া হয়।

শাকুর মজিদ তাকে নিয়ে নির্মাণ করেছেন ভাটির পুরুষ নামে একটি প্রামাণ্য চিত্র। এছাড়াও সুবচন নাট্য সংসদ তাঁকে নিয়ে শাকুর মজিদের লেখা মহাজনের নাও নাটকের ১০৭টি প্রদর্শনী করেছে। শাহ আবদুল করিমের প্রাপ্ত অন্যান্য সম্মাননা হলো— কথা সাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরী পদক (২০০০), রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার (২০০০), লেবাক অ‌্যাওয়ার্ড (২০০৩), মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার আজীবন সম্মাননা (২০০৪), সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস আজীবন সম্মাননা (২০০৫), বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতি সম্মাননা (২০০৬), খান বাহাদুর এহিয়া পদক (২০০৮), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা (২০০৮), হাতিল অ‌্যাওয়ার্ড (২০০৯), এনসিসি ব্যাংক এনএ সম্মাননা (২০০৯)।

প্রখ্যাত শিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য একবার বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-
"মানুষ আপনার গান বিকৃত সুরে গায়। আপনার সুর ছাড়া অন্য সুরে গায়। অনেকে আপনার নামটা পর্যন্ত বলে না। এসব দেখতে আপনার খারাপ লাগে না...?"
শাহ্ আবদুল করিম বললেন-
"কথা বোঝা গেলেই হইল... আমার আর কিচ্ছু দরকার নাই..."
কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য আশ্চর্য হয়ে বললেন-
"আপনার সৃষ্টি... আপনার গান। মানুষ আপনার সামনে বিকৃত করে গাইবে। আপনি কিছুই মনে করবেন না... এটা কোন কথা... এটার কোন অর্থ আছে...?"
শাহ্ আবদুল করিম বললেন-
"তুমি তো গান গাও... আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো... ধর তোমাকে একটা অনুষ্ঠানে ডাকা হলো। হাজার হাজার চেয়ার রাখা আছে কিন্তু গান শুনতে কোন মানুষ আসে নাই। শুধু সামনের সারিতে একটা মানুষ বসে আছে... গাইতে পারবে...? "
কালীপ্রসাদ কিছুক্ষন ভেবে উত্তর দিলেন-
"না... পারবো না..."
শাহ্ আবদুল করীম হেসে বললেন-
"আমি পারবো... কারণ আমার গানটার ভেতর দিয়ে আমি একটা আদর্শকে প্রচার করতে চাই। সেটা একজন মানুষের কাছে হলেও। সুর না থাকুক... নাম না থাকুক... সেই আদর্শটা থাকলেই হলো। আর কিছু দরকার নাই... সেজন্যই বললাম শুধু গানের কথা বোঝা গেলেই আমি খুশি..."
কালীপ্রসাদ ভট্টাচার্য জানতে চাইলেই-
"সেই আদর্শটা কি...?"
শাহ আবদুল করীম আবার হেসে বললেন-
"একদিন এই পৃথিবীটা বাউলের পৃথিবী হবে... 
এভাবে শাহ আবদুল করিমের স্মৃতিচারণ করেছিলেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য এবং আরও বলেছিলেন যে, উনার চোখে যে বিশ্বাস, মানে যুগ যুগ ধরে... আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, আমাদের দেশের কোনো রাষ্ট্রপতি কোনো প্রধানমন্ত্রীর চোখে এই বিশ্বাস নেই।... আমরা অনেক নেতাদের মুখে অনেক কথা শুনি, কিন্তু তারা বিশ্বাসে বলেন না কথাগুলো। তারা বলতে হয় বলে বলেন, নয় নিজের স্বার্থে বলেন, নয় লোককে ভুল বুঝানোর জন্য বলেন।”

একবার সুনামগঞ্জে তাকে সংবর্ধনা দেয়ার কথা। প্রোগ্রামের শেষের দিকে মাইকে ঘোষণা আসলো, এবারে বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের হাতে তুলে দেওয়া হবে তিন লাখ টাকার সম্মাননা চেক।
আব্দুল করিম বার্ধক্যে উপনীত। তিনি বোধহয় কানে ভুল শুনলেন। তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। তিনি পাশে বসে থাকা তার একমাত্র সন্তান জালালকে বললেন, জালাল ইতা কিতা কয়! তিন হাজার টাকা! এ তো অনেক টাকা! এত টাকা দিয়ে আমি কি করতাম!
আব্দুল করিমকে আস্তে করে জানানো হলো, তিন হাজার নয়, টাকার অংকটা তিন লাখ! শাহ আব্দুল করিম অস্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি হতভম্ব। তিনি বললেন, তিন লাখ? সর্বনাশ, অত টাকা! এগুলো নিয়্যা আমরা কিতা করমু? আমরার টাকার দরকার নাই, মানুষ যে ভালোবাসা দিছে, সেইটাই বড় প্রাপ্তি। চল চল বাড়ি চল। বলেই তিনি বেরিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা দিলেন।
একজন মানুষ কতটা আর নির্লোভ হতে পারেন! শাহ আবদুল করিম ছিলেন এমন ই একজন নিঃস্বার্থ, নির্লোভ প্রকৃতির মানুষ!

একবার তিনি রেডিও'র একটা চেক ভাঙ্গাতে গেলেন ব্যাংকে। আবদুল করিমের পরনে ছেঁড়া পাঞ্জাবি। তাকে দেখে ব্যাংকের কেউ কি ভেবেছে কে জানে! কিন্তু আবদুল করিম ভীষণ অপমানিত বোধ করেছেন। তিনি বিলাতে গান গাইতে গিয়েছিলেন, সেখানে দেখেছেন মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু নিজের দেশে দেখলেন এখানে মানুষের মর্যাদা পদ পদবিতে, পোষাকে, চেহারায়। 
এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন,
আমার পাঞ্জাবি ছেঁড়া তো কি হয়েছে, আমি কি এই দেশের নাগরিক না? আমার লুঙ্গিতে নাহয় তিনটা তালি বসানো, কিন্তু আমি তো ট্যাক্স ফাঁকি দেই নাই কখনো। তাহলে এত ব্যবধান, এত বৈষম্য কেন? মানুষ তো মানুষের কাছে যায়। আমি তো কোনো বন্যপশু যাইনি। বন্যপশুরও অনেক দাম আছে, এদেশে মানুষের কোনো দাম নেই, ইজ্জত নেই।

দেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সাথে  সম্পর্কের অবনতি  নিয়ে শাহ আবদুল করিম বলেন, 'হুমায়ূন সাহেব অত্যন্ত জ্ঞানী-গুণী মানুষ। আমি তাঁকে শ্রদ্ধাও করি। আমাকেও তিনি শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন। একবার তিনি টিভিতে একটি অনুষ্ঠান বানানোর জন্য একজন লোককে আমার কাছে পাঠালেন। প্রচার আমি কোনোসময়ই চাইনি, তখনো তা-ই করেছিলাম। কিন্তু লোকটির চাপাচাপিতে ঢাকা গেলাম। হুমায়ূন সাহেব আমার সাক্ষাত্কার নেওয়ালেন, গান গাওয়ালেন। আমি ফিরে আসার সময় উনি সৌজন্যসাক্ষাত্টুকু পর্যন্ত করলেন না, গাড়ির ড্রাইভারকে দিয়ে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেন। আমার হাসি পেল। এই টাকার জন্য কি আমি এতদূর ঢাকা ছুটে গিয়েছিলাম? আমি হাওরের বনে-বাদাড়ে বড় হয়েছি, মনটা সে রকমই বড়। টাকা আমার কাছে কিছুই না। এই করিম টাকার ধান্ধা করলে এতদিনে অনেক বড়লোক হতে পারত! কই, কখনো তো টাকার পেছনে ছুটিনি। এ ঘটনাটি আমাকে খুব পীড়া দেয়। পরে অনুষ্ঠানটি প্রচারের তারিখও তিনি আমাকে জানাননি। সে ঘটনাই আমি সাক্ষাত্কারে বলেছিলাম। পরে আর কখনো হুমায়ূন আহমদের কাছে যাইনি। সত্য কথা বলার কারণে যদি সম্পর্কের অবনতি হয়ে থাকে—তাতে তো আমার আর কিছুই করার নাই।'
ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মানবোধ কাকে বলে বাউল দেখিয়ে গিয়েছেন।
তিনি একবার বলেছিলেন, 'এত সংবর্ধনা, সম্মান দিয়ে আমার কী হবে? সংবর্ধনা বিক্রি করে দিরাই বাজারে এক সের চালও কেনা যায় না। পেটে যদি ভাত না থাকে করিম মেডেল গলায় দিয়ে কী করবে?'
স্পষ্টতায়, স্পর্ধায় কাটিয়েছেন এক বাউল জীবন।

"এই করিমকে মানুষ তখন খুঁজে পাবে শুধুই গানে আর সুরে" - তাঁর বিভিন্ন গানের সারমর্ম বা তত্ত্ব নিয়ে বলেছিলেন শাহ আবদুল করিম নিজেই। আসলেই তিনি সঠিক কথাটাই বলে গিয়েছিলেন এই বাউল সাধক। মানুষ ঠিকই তাঁকে খুঁজে তাঁর গানে আর সুরে। শত বছর পেরিয়েও এখনো কত সমকালীন ও প্রাসঙ্গিক তাঁর গান, সুর আর দর্শন। গ্রামের বাজারের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে মফস্বল শহরে কিংবা গাছের নিচের বাঁশের মাচা কিংবা পাঁচ তারকা হোটেলের লবি বয়স্ক কিংবা বর্তমান তরুণ প্রজন্মদের হুটহাট আড্ডায় বা ট্যুরে পাহাড়ে-সমদ্র তীড়ে, গ্রাম কিংবা আধুনিক শহর- সর্বত্র সব প্রজন্মের কাছেই আছে উনার লেখা আর সুর করা গানের উপস্থিতি। এজন্যই তিনি এক ব্যতিক্রমী বাউল, বাউল সংগীতকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এজন্যই তিনি প্রজন্মের কাছে বাউল সম্রাট হিসেবে গণ্য হয়েছেন।

শাহ আবদুল করিম কাগমারী সম্মেলনে গান করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাদের শ্রদ্ধা আদায় করে নেন। শাহ আবদুল করিম বেড়ে ওঠার সময় লোকসাহিত্যের একটি উজ্জ্বল পরিবেশ ছিল। শাহ আবদুল করিম ৫৪'র নির্বাচন ৬৯ এর গণ আন্দোলন, ৭১'এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি পর্যায়ে স্বরচিত গনসঙ্গীত পরিবেশন করে জনতাকে দেশ মার্তৃকার টানে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছেন। তাঁর গণসঙ্গীতে মুগ্ধ হয়ে মাওলানা আবদুল হামিদ থান ভাসানী তাঁর পিটে হাত রেখে বলেছিলেন- "বেটা, গানের একাগ্রতা ছাড়িও না, তুমি একদিন গণ মানুষের শিল্পী হবে।"
একবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সুনামগঞ্জ আসেন, সেই সম্মেলনে শাহ আবদুল করিমকেও ডাকা হয় এবং একটি গান গাইলেন, শাহ আবদুল করিমের গান শুনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১০০ টাকা পুরস্কার দিয়ে বলেন, "মুজিব ভাই থাকলে করিম ভাই থাকবে।"

শাহ আবদুল করিম শরীয়তি, মারফতি, দেহতত্ত্ব, গণসংগীতসহ বাউল গান এবং গানের অন্যান্য শাখার চর্চাও করেছেন।  এছাড়াও লালন ফকির, হাছন রাজা, রাধারমন, দূরবীন শাহ, উকিল মুন্সী, আরকুম শাহ, শিতালং শাহ কে মনেপ্রাণে লালন করে গান বুনেছেন, গান গেয়েছেন। সে সব গান দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। অথচ একসময় গান গাওয়ার অপরাধে ঈদের নামাজের জামাত এমনকি পরে গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন শাহ আবদুল করিম। শাহ আবদুল করিম ছিলেন ধীর-স্থির কিন্তু দৃঢ়চেতা একজন মানুষ। গ্রামবাসীর একজন ঈদের জামাতে হঠাৎ উঠে ইমাম সাহেবকে বললেন যে, করিম যদি গান-বাজনা না ছাড়ে, তাইলে আমরা তার সাথে একই জামাতে নামাজ পড়ব না। তার এইসব কর্মকাণ্ড বেদাত। আমরা তার গানের জন্য রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। তখন ইমাম সাহেব শাহ আবদুল করিমকে জিজ্ঞেস করলেন যে, তিনি গান বাজনা ছাড়বেন কিনা। নইলে তিনি এই ঈদের জামাতে নামাজ পড়তে পারবেন না। শাহ আবদুল করিম প্রথমে নিশ্চুপ! ইমাম সাহেব আবারো একই কথা জিজ্ঞেস করলেন। এদিকে মুসুল্লিরা একটু উত্তেজিত হচ্ছেন। এমন সময় শাহ আবদুল করিমের এক শুভাকাঙ্খী তাঁকে বললেন, আরে মিয়া আপাতত বলে দাও যে আর গান-বাজনা করব না, পরেরটা পরে দেখা যাবে। আজ ঈদের দিন, কোনো গণ্ডগোল করো না। কিন্তু শাহ আব্দুল করিম সোজা উঠে দাঁড়িয়ে। স্পষ্ট করে সেই ঈদের জামাতে বললেন, 'আমি গান-বাজনা ছাড়া বাঁচতে পারবো না এবং গান-বাজনা ছাড়ব না।' এই বলে তিনি সেই ঈদের জামাত ত্যাগ করলেন। একই কারণে তাঁর স্ত্রী সরলা খাতুনের জানাজা পড়াতে রাজি হয়নি গ্রামবাসী ও গ্রামের সেই মসজিদের ইমাম। অথচ আজ পুরো বাঙালির অন্তরে জায়গা নিয়েছে তাঁর দর্শন, কণ্ঠে স্থান পেয়েছে তাঁর গান।
শাহ আবদুল করিম এখন শুধু বাংলাদেশেই চর্চার বিষয় নয়, এখন পৃথিবী ব্যাপী আলোচনায় আছেন ভাটির পুরুষ কালনীর ঢেউয়ে বেড়ে উঠা এই মহাজন। ইতিমধ্যে তাঁর ১০টি গান বাংলা একাডেমি কর্তৃক ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে এবং তাঁর গান নিয়ে আরো কাজ চলছে। তার রচিত দেড় হাজার গানের মধ্যে সংগ্রহে আছে মাত্র ৬শ’। 

শেষ করছি শাহ আবদুল করিমের সুদীর্ঘ ২৭ বছরের শিষ্য বাউল আবদুর রহমান বক্তব্য দিয়ে-- 
"১১ সেপ্টেম্বরের সন্ধ্যাবেলা। আমি এবং আমার ওস্তাদের ছেলে শাহ নূর জালাল সিলেটের নুর জাহান ক্লিনিকে (শাহ জালাল রহঃ এর মাজারের সামনে) আমার মুর্শিদ শাহ আব্দুল করিমের শয্যা পাশে বসে আছি। ওস্তাদের খুব শাসকষ্ট হচ্ছিল। তাঁর ছেলে ডাক্তার ডাকার জন্য বাহিরে গেলেন। ওস্তাদ আমার দিকে তাকিয়ে চোখ ঘুরালেন, আমাকে কাছে ডাকলেন। আমি তাঁর মাথার কাছে গিয়ে বসলাম। আমার মাথায় তিনি হাত বুলালেন। এত কষ্টের মাঝেও একটু হাসার চেষ্টা করলেন। আমার জন্য দোয়া করলেন আর বললেন— কাজ-কর্ম ফেলে রেখে আমার কাছে হাসপাতালে বসে আছিস। গানকে তুই ভালোবাসিস। মানুষ তোকে ভালোবাসবে। আমার মাথা থেকে হাতটি পরে গেল। এর মধ্যে ডাক্তার আসলেন। আমার ওস্তাদকে দ্রুত আইসিইউতে নিয়ে গেলেন। সারারাত আইসিইউতে থাকার পর ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর, ভোর ৪টা ৫৫ মিনিটে আমার উস্তাদ আমাদের মায়া ছেড়ে ওই পাড়ে চলে গেলেন।  যৌবনের শুরুতেই আমার ওস্তাদের সাথে টানা ৩/৪ বছর ছিলাম। আমি ছিলাম অবিবাহিত, বাবা -মায়ের এক ছেলে। জমি-জিরাতও কিছু ছিল। একদিন ওস্তাদ আমাকে বললেন, তুমি বিয়ে করো। তারপর আবার আমার কাছে আসো। আমি বিয়ে করে আমার ওস্তাদের কাছে যাই এবং তাকে মুর্শিদ রূপে গ্রহণ করি। ওস্তাদ আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তাই আমাকে মৃত্যুর আগে দোয়া করে গেলেন।

তিনি আরো জানালেন, প্রথমে ওস্তাদের জানাজা হয় হযরত শাহজালাল (রহঃ) এর মাজার প্রাঙ্গণে। দ্বিতীয় জানাজা হয় সিলেট কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। তৃতীয় জানাজা হয় দিরাই উপজেলা কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে। প্রত্যেক জানাজায় হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হন। কিন্তু কোনো একসময় আমার মুর্শিদকে গান গাওয়ার অপরাধে ঈদের জামাত থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। তারপর আমরা আমাদের ওস্তাদকে নিয়ে রওনা দেই ওনার গ্রামের দিকে, আমার সাথে ছিলেন ওস্তাদের আরেক শিষ্য রণেশ ঠাকুর সহ অনেকে। এইতো আর কিছুদিন। আবার চলে এলো মুর্শিদের ওফাত দিবস। আমরা সারারাত ওনার বাড়িতে ওনার গান গাইবো। কিন্তু মুর্শিদ আমার আর আমাদের সাথে গাইবেন না— কথাগুলো বলে আর কিছু বলতে পারলেন না তিনি। কান্নায় ভেঙে পড়লেন।"

শাহ আবদুল করিমের স্ত্রী সরলা মৃত্যুবরণ করেন ১৯৯৭ সালে। শাহ আবদুল করিম সরলার কবর তাঁর শোবার ঘরের সামনে দিয়েছেন। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম সিলেটের নুরজাহান পলি ক্লিনিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী শাহ আবদুল করিমকে সরলার কবরের পাশে দাফন করা হয়। আজ এই প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইলো প্রাণপ্রিয় সাধক, গান-সুরের মহাজন শাহ আবদুল করিমের স্মৃতি ও আত্মার প্রতি।


শাহ আবদুল করিমের কিছু জনপ্রিয় গান সমূহঃ

- আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
- গাড়ি চলে না চলে না
- আসি বলে গেল বন্ধু আইলনা
- কেনে পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু
- আমি কুলহারা কলঙ্কিনী
- কেমনে ভুলিবো আমি
- কী জাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে
- বসন্ত বাতাসে সই গো
- প্রাণনাথ ছাড়িয়া যাইওনা মোরে
- আগের বাহাদুরি এখন গেল কই
- কেমনে চিনিব তোমারে
- বসন্ত বাতাসে সইগো
- পিরিতে শান্তি মিলে না 
- সখী তোরা প্রেম করিওনা
- কোন মেস্তরি নাও বানাইছে কেমন দেখা যায়
- সখি কুঞ্জ সাজাওগো
- তুমি বিনে আকুল পরাণ
- রঙের দুনিয়া তোরে চাই না
- তুমি রাখ কিবা মার
- তোমার কি দয়া লাগে না
- আমি এই মিনতি করিরে
- মানুষ হয়ে তালাশ করলে
- আমার বন্ধুয়া বিহনে গো
- আমি বাংলা মায়ের ছেলে
- মন মজালে ওরে বাউলা গান
- আমার মাটির পিনজিরার সোনার ময়নারে
- আইলায় না আইলায় নারে বন্ধু
- আমি তোমার কলের গাড়ি
- তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো
- গান গাই আমার মনরে বুঝাই
- দয়া কর দয়াল তোমার দয়ার বলে
- প্রানবন্ধুর পিরিতে আমার মন উদাসি
- আমি তোরে চাইরে বন্ধু
- বন্ধুরে কই পাব সখি গো
- খুজিয়া পাইলাম নারে বন্ধু
- মহাজনে বানাইয়াছে
- ভব সাগরের নাইয়া ইত্যাদি গান দেশে বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট, উইকিপিডিয়া, ব্লগ 

Posted: Sunday, September 12, 2021
Post By: FarhaN Fahidur Rahim

Related Song Lyrics

0 মন্তব্য(গুলি)